The Bangladesh Today | Uniting people everyday

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১

তামাকের ব্যবহার রোধে স্থানীয় সরকারের নির্দেশিকা

তামাকের ব্যবহার রোধে স্থানীয় সরকারের নির্দেশিকা

সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে তামাক ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে দিতে স্থানীয় সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে আগামী দিনে মহামারীর আকার নিতে চলেছে ক্যান্সারসহ অসংক্রামক রোগ। তামাক ব্যবহার বন্ধের ডাক নানা কারণেই দেওয়া হয়ে থাকে।

তবে করোনাকালীন তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি কারো মনে ভাবনা থাকে তামাক গ্রহণের অভ্যাস ত্যাগ করার, তবে এর চেয়ে ভাল সময় আর হয় না।

নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ঠিক যে কারণে মাস্ক পরা, মাঝে মাঝে হাত পরিষ্কার করার অভ্যাস চালু করা গিয়েছে, সে কারণে ধূমপান ছাড়াও দরকার। ফুসফুসের ক্ষতি করছে ভাইরাস।

শরীর ভাইরাসমুক্ত হওয়ার অনেক দিন পরেও সেই সমস্যা থেকে যাচ্ছে কারও কারও মধ্যে। ফলে এই সময়ে ধূমপান ও তামাক সেবন করে ফুসফুসের উপরে বাড়তি চাপ না দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন চিকিৎসক ও গবেষকেরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) একটি সমীক্ষা চালিয়েছে কোভিড এবং ধূমপানের মধ্যে সম্পর্ক বুঝে নিতে। তাতে দেখা গিয়েছে, যে সব মানুষ নিয়মিত ধূমপান করেন, তাঁরা সংক্রমিত হলে অসুস্থতা অনেক গুরুতর আকার নিচ্ছে।

করোনায় সংক্রমিত হলে শ্বাসের সমস্যা বহু রোগীর মধ্যে দেখা দেয়। ধূমপান এমনিতেই শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা খানিক কমিয়ে দেয়। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, যে কোনও ধূমপায়ীর চেয়ে অধূমপায়ীদের শ্বাস নেওয়ার শক্তি বেশি থাকে। করোনাকালে শ্বাস নেওয়ার শক্তি কমে গিয়ে মৃত্যুও ঘটছে। ফলে এখন নিজের শ্বাসযন্ত্র সুরক্ষিত রাখতে ধূমপান ছাড়া অবশ্য কর্তব্য।

উন্নত দেশগুলি ইতিমধ্যেই ধূমপানের ক্ষেত্রে কড়া বিধিনিষেধ জারি করেছে। তামাকের ব্যবহার সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ, যা প্রতিরোধযোগ্য।

এর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে অসুস্থতা, অক্ষমতা, পঙ্গুত্ব, মৃত্যুহার বৃদ্ধিসহ আর্থিক ব্যায় ও পরিবেশগত বিপর্যয়। বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দশটি তামাক ব্যবহাকারী দেশের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত।

পৃথিবীর বহু দেশের বিশ্ব নেতারা এই মুহুর্তে অর্থনীতির চেয়ে মানুষের জীবনকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে এখন পর্যন্ত জনস্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব¡ দিচ্ছে। অর্থনীতির বিবেচনায় যাই হোক, এ মুহূর্তে স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। তাই মহামারির এই পরিস্থিতিতে তামাক কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে সরকার দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

অপরপক্ষে আমাদের মত দেশসমূহে তামাক কোম্পানিগুলোর মুল টার্গেট শিশু, কিশোর ও তরুণ সমাজ। তাদেরকে তামাক ও ধূমপানে আসক্ত করার পাশপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে।

টোব্যাকো এটলাস-২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে ১ লাখ ৬০ হাজার ২০০ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে। এছাড়া ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের এক জরিপের দেখা যায় শতকরা ৯০.৬ ভাগ স্কুল ও খেলার মাঠের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে।

আবার শতকরা ৬৪.১৯ ভাগ দোকানে ক্যান্ডি, চকলেট এবং খেলনার পাশে তামাকজাত দ্রব্য রেখে বিক্রি করতে দেখা যায়। শতকরা ৮২.১৭ ভাগ দোকানে তামাকের বিজ্ঞাপন এবং শিশুদের দৃষ্টি সীমানার মধ্যে শতকরা ৮১.৮৭ ভাগ দোকানে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শন হয় বলে ঐ জরিপে উঠে আসে। তামাক কোম্পানিগুলো কুটকৌশলে তামাক শিশু ও যুবকদের সামনে তুলে ধরে। এর মূল কারণ তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটানো। 

স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯-এর ধারা ১১.১ (খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যাদি) অনুসারে সিটি কর্পোরেশন খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যাদি বিক্রয়ের উপর লাইসেন্স আরোপ এবং ভ্রাম্যমান বিক্রয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা উল্লেখ করা হয়েছে এবং পৌরসভা আদর্শ কর তফসিল, ২০১৪ এর ৬ এ পেশা, ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবিকা-বৃত্তি, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির উপর কর আরোপ, সিগারেটের দোকানগুলোতে লাইসেন্স প্রদান করার বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

সুতরাং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা বন্ধ এবং পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী/কোম্পানী ও বিক্রেতাকে লাইসেন্সের আওতাভূক্ত করে যত্রতত্র তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের শিশু, কিশোর ও তরুণ সমাজকে রক্ষা করা সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব।

সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের স্বার্থে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি সুপরিকল্পিত কর্ম পরিকল্পনা বা নির্দেশিকা প্রনয়ন করেছে।

এ লক্ষ্যেই স্থানীয় সরকার বিভাগ এ নির্দেশিকার আলোকে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি হতে রক্ষা করবে।

এই নির্দেশিকাটি স্থানীয় সরকার বিভাগের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আওতাভূক্ত সকল পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের মাত্রা হ্রাস করে জনসাধারণকে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করবে। 

এছাড়া এই নির্দেশিকা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় ও বিপণন নিয়ন্ত্রণের জন্য তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের সাথে সম্পৃক্তদের নির্ধারিত ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণের ব্যবস্থা করেছে।

এর কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রের আশেপাশের এলাকা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, খাবারের দোকান, রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তামাকজাত পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে। সহজলভ্যতা ও সহজপ্রাপ্যতার কারণে বাড়ছে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা। স্থানীয় সরকার বিভাগের এই উদ্যোগ প্রসংশিত এবং যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

যখন স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশিকাটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখনই তামাক কোম্পানির সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছ এবং সরকারের এই অর্জনকে ম্লান করে দেয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে।

তামাকজাত পণ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(১) এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯ তফসিল ১ ও ৫ অনুসারে স্থানীয় সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা উপেক্ষা করে চলছে তামাক কোম্পানিগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি করছে। বিধায় এই নির্দেশিকা জনগণের রক্ষাকবজ হলেও তামাক কোম্পানির মৃত্যু পণ্য বিপণন ও মুনাফার পথে অন্তরায়।

ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণের ও নিবন্ধন ব্যবস্থা কার্যকরের মাধ্যমে স্কুল-কলেজ, হাসপাতালসহ বিভিন্ন এলাকায় যত্রতত্র তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয় কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত হবে, ফলে আগামী প্রজন্ম ঘাতক তামাকের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

যখন দেশের মানুষ ঘাতক তামাক নিয়ন্ত্রণে আশার আলো দেখছে তখনই নির্দেশিকাটি বাতিলে তামাক কোম্পানিগুলো মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং নীতিনির্ধারকদের বিভিন্নভাবে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

মিডিয়া ও বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জেনেছি স্থানীয় সরকার বিভাগ আগামী ১৫ নভেম্বর তামাক কোম্পানির প্রতিনিধি ও তামাক ব্যবসায় সংশ্লিষ্টদের সাথে সভা করা ও নির্দেশিকা নিয়ে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যা, অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও জনস্বার্থের পরিপন্থি।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা আছে। বাংলাদেশ যেহেতু আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এফসিটিসি স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর করেছে তাই এফসিটিসি ও এর আর্টিকেল ৫.৩ ও অন্যান্য আর্টিকেলসমূহ প্রতিপালন করা সরকারের দায়িত্ব।

এফসিটিসির আর্টিকেল ৫.৩- তে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে তামাক কোম্পানির প্রভাবমুক্ত রাখার বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সরকারের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আছেন, যারা ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডের সদস্য।

তামাক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তামাক কোম্পানির এবং তামাক কোম্পানির সহযোগীদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। যাতে জনগণ এই জনস্বাস্থ্যের এই অশুভ শক্তিকে চিহ্নিত করতে পারে।

লেখক: ইকবাল মাসুদ, পরিচালক, স্বাস্থ্য ও ওয়াশ সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন, সদস্য, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
 


সর্বশেষ