The Bangladesh Today | Uniting people everyday

ঢাকা সোমবার, ০৮ অগাস্ট ২০২২

জাবিতে নিয়ম ভেঙে চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রার নিয়োগ

জাবিতে নিয়ম ভেঙে চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রার নিয়োগ
ছবি: টিবিটি

জুবায়ের আহমেদ, জাবি প্রতিনিধি:  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার হিসেবে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) রহিমা কানিজকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

গত ২৭ জুন অনুষ্ঠিত বিশেষ এক সিন্ডিকেট সভায় রহিমা কানিজের অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটি(এলপিআর) কমিয়ে ৬ জুলাই, ২০২২ থেকে তাকে একবছর মেয়াদী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। ২৯ জুন সেশন বেনিফিট ভোগ শেষে অবসরে যান ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ। এবং রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয় কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. রাশেদা আখতার-কে।

যদিও ২০ মার্চ, ২০২২-এ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রকাশিত এক চিঠিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদ সমূহে [রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ইত্যাদি] ভারপ্রাপ্ত, অতিরিক্ত দায়িত্ব বা চলতি দায়িত্ব, চুক্তিভিত্তিক/খণ্ডকালীন দায়িত্ব না দিয়ে পূর্ণকালীন নিয়োগ দিয়ে তাদের জানাতে বলা হয়েছে। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এযাবৎকাল পর্যন্ত রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়া হয়েছে বয়োজ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে, যদিও এ সম্পর্কিত কোনো লিখিত নিয়ম নেই। তবে এবারের রেজিস্ট্রার নিয়োগের ক্ষেত্রে গঠন করা হয়েছিল ইন্টারভিউ বোর্ড যেখানে প্রার্থী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন সিনিয়র ডেপুটি রেজিস্ট্রার। তাঁরা হলেন, ডেপুটি রেজিস্ট্রার (উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি-১), আবুল কালাম আজাদ, ডেপুটি রেজিস্ট্রার (স্টোর) তাজনাহার বেগম, ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) আবু হাসান এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রসাশন-২/কাউন্সিল) বি. এম. কামরুজ্জামান। তবে সিলেকশন বোর্ডে চ্যান্সেলর্স নমিনি হিসেবে দুইজন সরকারি কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও এই বোর্ডে কোনো সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না।

এছাড়াও গুরুত্ত্বপূর্ণ কোন পদের নিয়োগ ভাইবার নূন্যতম ৭ দিন পূর্বে প্রার্থীদের অবহিত করার নিয়ম থাকলেও রেজিস্ট্রার পদপ্রার্থীদের ইন্টারভিউয়ের আগের দিন রাতে ফোন করে জানানো হয় ইন্টারভিউয়ের ব্যাপারে। এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ নিজে একজন প্রার্থী হয়ে অন্য প্রার্থীদের নিকট ২৬ জুন নিয়োগ পরীক্ষার দিন চিঠি পাঠিয়েছেন ইন্টারভিউ বোর্ড এর বিষয়ে অবগত করে।

এর প্রেক্ষিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানিয়ে উপাচার্য বরাবর চিঠি দেন প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ। আরেক প্রার্থী তাজানাহার বেগম রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ প্রেরিত চিঠি গ্রহণ করেন নি। ফলশ্রুতিতে বোর্ড বসার আধ ঘন্টা আগে বাতিল হয়ে যায় রেজিস্ট্রার নিয়োগ পরীক্ষা।

পরবর্তীতে ২৭ জুন অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় রহিমা কানিজকে ৬ জুলাই থেকে এক বছর মেয়াদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায় ২০১৫ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত এক সিন্ডিকেট সভায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন নেয়া সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এতদিন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 এ বিষয়ে সর্বশেষ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রাপ্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার আব্দুল হান্নান বলেন, ‘সিন্ডিকেট থেকে আমাকে প্রথমে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলেও কোন অফিসিয়াল চিঠি দেয় নাই।

এরপরে এক সিন্ডিকেটে এজেন্ডা করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে দেয়া হয়। আমার পূর্বে পিডিও, ডেপুটি কম্পট্রোলার সহ অনেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ছিলেন কিন্তু আমার সময় থেকে আমার নিয়োগসহ এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগই বাতিল হয়ে যায়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে সাবেক ভিসি ফারজানা ইসলামের বলয় যাতে না ভেঙে যায় এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ধরা না পড়ে সে জন্য এই পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। 

এদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় যে, ২৯ জুন বিকেলবেলা শেষ কর্মদিবসে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ কাউন্সিল অফিসে সংরক্ষিত ২০১৪ ও ২০১৫ সালের অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সমূহের এজেন্ডা ও সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করে রাখা রেজিস্ট্রি খাতা দুটি নিজের সাথে করে বাসায় নিয়ে গেছেন। যেহেতু রহিমা কানিজের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ৬ জুলাই থেকে কার্যকর হবে বিধায় রেজিস্ট্রি খাতা তার নিজের কাছে রাখা বিশ্ববিদ্যালয় আইনের পরপন্থি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. রাশেদা আখতার বলেন, ‘আমাকে ৫ তারিখ পর্যন্ত নিয়োগ দেয়া হয়েছে, এরপরে এই বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত হবে এটা উপাচার্য বলতে পারেন।’ ২০১৫ সালের সিন্ডিকেটের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে ঐ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ডেপুটি রেজিস্ট্রার (উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি-১), আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সিন্ডিকেটে ২০১৫ সালে সিদ্ধান্ত আছে যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হবে না, রেজিস্ট্রার নিয়োগের ক্ষেত্রে ইন্টারভিউ বোর্ড আগে কখনো করা হয় নাই সবসময় সিনিয়রিটির ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সেখানে রাতে একজন প্রার্থী নিজে ইন্টারভিউ লেটার টাইপ করে সকালে অন্য প্রার্থীদের চিঠি দিছে যে বিকেলে ইন্টারভিউ বোর্ড বসবে। এরকম তো হয় না, সাত দিন পূর্বে চিঠি দেয়ার নিয়ম।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই প্রশাসন তো পূর্ববতী প্রশাসনের ধারাবাহিকতা, পূর্ববর্তী প্রশাসনের নিশ্চয়ই কোনো বিষয় আছে যেগুলো তারা কাউকে জানতে দিতে চায় না যার জন্য তারা এসব করছে।’

ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা), আবু হাসান বলেন, ‘আমি কিছু জানি না এ বিষয়ে এবং খুব একটা আগ্রহ বোধ করছি না।’

ডেপুটি রেজিস্ট্রার (স্টোর) তাজনাহার বেগম বলেন, ‘একটা বড় পদের নিয়োগের নিয়ম হচ্ছে ৭ দিন আগে জানানো। প্রশাসন থেকে আগের বছর ফেব্রুয়ারিতে রেজিস্ট্রার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার পর হুট করে এখন একদিনের নোটিশে ইন্টারভিউ বোর্ড বসানো এসব দেখে আমি নিয়োগ পরীক্ষার চিঠি গ্রহণ না করে ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছি।’

২০১৫ সালের সিন্ডিকেটের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এইটা জানতাম না আমি। সাধারণত এ ধরনের বিষয়গুলো অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে পয়েন্ট আউট করা হয় তবে এই সিন্ডিকেটে এটা পয়েন্ট আউট করা হয়নি এবং এ সংক্রান্ত কোন আলাপ হয় নি’

ইউজিসি চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম বলেন,‘আমরা কনট্র্যাকচুয়াল করতে বলি নাই তো! আমরা যেটা বলেছি যে যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি রেজিস্ট্রার সহ সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থায়ী নিয়োগ দিতে হবে।

ইউজিসি কর্মকর্তাদের জন্য উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দিতে বলেছে। উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তিতে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর ডেপুটি রেজিস্ট্রার আছে তাদের মধ্যে অনেকে সিনিয়র আছেন, তারা অংশগ্রহন করবে সেখান থেকে নিয়োগ হবে, প্রার্থীর অভাব নাই তো। এখানে কনট্র্যাকচুয়াল নিয়োগের কোন প্রয়োজন নাই তো।’

এ বিষয়ে মন্তব্য নেয়ার জন্য উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলমকে একাধিক বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।